
এই অধ্যায় শেষে আমরা-
- কম্পিউটার কেমন করে কাজ করে তা বর্ণনা করতে পারব;
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার হয় সেগুলো বর্ণনা করতে পারব;
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে যেসব যন্ত্র ব্যবহৃত হয় তার কাজ ব্যাখ্যা করতে পারব;
- হার্ডওয়্যার আর সফটওয়্যার কী তা ব্যাখ্যা করতে পারব।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
আরিফ নতুন কম্পিউটার কিনেছে যার ভেতর কোনো রকম সফটওয়্যার দেওয়া নাই। একই সাথে সে একটি অপারেটিং সিস্টেম সিডি এবং কয়েকটি অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারের সিডি কিনেছে যেমন ছবি আঁকার, গান শোনার, সিনেমা দেখার ইত্যাদি।
শিমূল এবং কাকন ক্রিকেট ওয়ার্ল্ড কাপ এর টিকিট সংগ্রহ করতে পারে নি। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিল তারা বড় স্ক্রিন এ খেলাটি দেখবে।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জনাব শফিকুল ইসলাম বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের একটি ডিজিটাল ব্যানার বানানোর জন্য শাহীন ডিজিটালে গেলেন। শাহীন ডিজিটাল শফিকুল ইসলাম স্যারের নিকট থেকে লেখাগুলো নিয়ে টাইপ করে একটি বিশেষ যন্ত্র দিয়ে ছাপিয়ে দিল।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সারা পৃথিবীতে যে বিশাল পরিবর্তন শুরু হয়েছে তার পেছনে যে যন্ত্রটি সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রেখেছে সেটি হচ্ছে কম্পিউটার। আমরা আগেই বলেছি, কম্পিউটার বললেই একসময় আমাদের সামনে টেলিভিশন স্ক্রিনের মতো একটা মনিটর, কী-বোর্ড আর বাক্সের মতো একটা সিপিইউ এর ছবি ভেসে ওঠে। কারণ আমরা সবাই সেটা দেখে সবচেয়ে বেশি অভ্যস্ত। আজকাল কম্পিউটার বললেই বড়ো একটা খোলা বইয়ের মতো ল্যাপটপের ছবি ভেসে ওঠে; কিন্তু এ ছাড়াও আরও অনেক রকম কম্পিউটার আছে ছবিতে যা দেখানো হলো ।

কম্পিউটার যন্ত্রটি কেন সারা পৃথিবীতে এত বড়ো পরিবর্তন আনতে পারে আমরা ইতোমধ্যে সেটা তোমাদের বলেছি। যন্ত্রপাতিগুলো তৈরি করা হয় একটা নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য। ক্রু ড্রাইভার দিয়ে শুধু স্ক্রু খোলা যায়। গাড়ি দিয়ে মানুষ যাতায়াত করে। আমরা গাড়ি দিয়ে ক্রু খুলতে পারব না কিংবা স্ক্রু ড্রাইভার দিয়ে মানুষ যাতায়াত করতে পারবে না। কিন্তু কম্পিউটার অন্য রকম যন্ত্র, সেটা দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অসংখ্য কাজ করা যায়। কম্পিউটার দিয়ে একদিকে যেরকম জটিল হিসাব নিকাশ করা যায়, অন্যদিকে সেটা ব্যবহার করে ছবিও আঁকা যায়। কাজেই অনেক কাজ করার উপযোগী একটা যন্ত্র যে পৃথিবীতে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলতে পারে তাতে অবাক হওয়ার কী আছে?
তোমরা সবাই নিশ্চয়ই জানতে চাও কম্পিউটার কেমন করে কাজ করে। তোমাদের অনেকের হয়ত মনে হতে পারে যে, কম্পিউটারের কাজ করার পদ্ধতিটা খুবই জটিল। কিন্তু আসলে সেটি সত্যি নয়। কম্পিউটারের কাজ করার মূল পদ্ধতিটা খুবই সোজা। নিচে তোমাদের একটা কম্পিউটারের কাজ করার ছবি দেখানো হলো ঃ

ছবিটিতে তোমরা দেখতে পাচ্ছ এর পাঁচটি মূল অংশ রয়েছে। যথা-ইনপুট ইউনিট, আউটপুট ইউনিট, মেমরি, প্রসেসর ও কন্ট্রোল ইউনিট। যখন ইনপুট ইউনিট দিয়ে কম্পিউটারের ভেতরে উপাত্ত বা ডেটা দাও, তখন কম্পিউটারের মেমরিতে সেগুলো জমা রাখা হয়। প্রসেসর মেমরি থেকে উপাত্ত নিয়ে সেগুলো প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াকরণ করে ফলাফল মেমরিতে জমা রাখে। কাজ শেষ হলে আউটপুট ইউনিট দিয়ে তোমাকে তথ্য বা ইনফরশেন ফিরিয়ে দেয় এবং কন্ট্রোল ইউনিট পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে।
তোমরা যারা কম্পিউটার দেখেছ বা ব্যবহার করেছ তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ কম্পিউটারের কী-বোর্ড কিংবা মাউস হচ্ছে ইনপুট দেওয়ার মাধ্যম, এটা দিয়ে আমরা কম্পিউটারের ভেতরে উপাত্ত পাঠাই। কম্পিউটার কাজ শেষ হলে তার ফলাফলগুলো মনিটরে দেখায় কিংবা প্রিন্টারে প্রিন্ট করে দেয়। কাজেই এগুলো হচ্ছে আউটপুট পাঠানোর মাধ্যম। কম্পিউটারের মেমোরি কিংবা প্রসেসর আমরা বাইরে থেকে দেখতে পাই না, সেগুলো ভেতরে থাকে।
আমরা ইনপুট এবং আউটপুট ডিভাইস হিসেবে এখানে কী-বোর্ড, মাউস, মনিটর এবং প্রিন্টারের কথা বলেছি। তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ এগুলো ছাড়াও আরও অনেক ধরনের যন্ত্রপাতি থাকতে পারে, পরের পাঠগুলোতে আমরা সেই বিষয়গুলোর কথা বলব।

কম্পিউটার কীভাবে কাজ করে সেটা আমরা বলেছি। কিন্তু কীভাবে একই কম্পিউটার কখনো ছবি আঁকার কাজে ব্যবহৃত হয়, আবার কখনো গান শোনার কাজে ব্যবহৃত হয়, কিংবা কখনো জটিল হিসাবনিকাশ করার জন্য ব্যবহৃত হয়, সেটি এখনো বলিনি। সেই বিষয়টির কথা যদি না জানো, তাহলে কম্পিউটার সম্পর্কে তোমার জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
একটু আগে আমরা ইনপুট, আউটপুট, মেমোরি আর প্রসেসরের কথা বলেছি, সেগুলো হচ্ছে কোনো না কোনো যন্ত্রপাতি। কম্পিউটারের যন্ত্রপাতির এই অংশগুলোকে বলে কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার। কম্পিউটার দিয়ে কাজ করার সময় তার মেমোরিতে নির্দিষ্ট ধরনের উপাত্ত রাখতে হয়, সেগুলো প্রসেসরে গিয়ে প্রসেসরকে দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কাজ করাতে পারে সেইগুলোকে বলে সফটওয়্যার। তাই যখন একটা কম্পিউটার দিয়ে জটিল হিসাবনিকাশ করা হয়, তখন হিসাবনিকাশ করার সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়, আবার যখন ছবি আঁকতে হয় তখন ছবি আঁকার সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়। মানুষের বুদ্ধিমত্তা পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার থেকেও বেশি ক্ষমতাশালী। তাই কখনোই একজন মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সাথে তুলনা করা ঠিক নয়-তারপরও হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের উদাহরণ দেওয়ার জন্যে সহজ করে এভাবে বলা যায়-একটা শিশু যখন জন্ম নেয় তখন সে নিজে থেকে কিছুই করতে পারে না; তার কারণ তার মস্তিষ্কটাকে বলা যায় সফটওয়্যারবিহীন হার্ডওয়্যার। শিশুটি যখন তোমাদের বয়সী হয় তখন সে তোমাদের মতো অনেক কাজ করতে পারে- বলা যেতে পারে তার হার্ডওয়্যারে অনেকগুলো সফটওয়্যার এখন ঢোকানো হয়েছে-তাই সে সেই কাজগুলো করতে পারছে।
আবার তোমাদের মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মানুষের মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সাথে তুলনা করা হলে মস্তিষ্ককে অপমান করা হয়। মানুষের মস্তিষ্ক কিন্তু পৃথিবীর চমকপ্রদ এবং অসাধারণ একটি বিষয়।
কাজ ১. তোমরা চারজন করে একটি দল তৈরি কর। একজন ইনপুট ডিভাইসের দায়িত্ব পালন করবে একজন আউটপুট ডিভাইসের দায়িত্ব পালন করবে। অন্য দুজনের একজন হবে মেমোরি, অন্যজন হবে প্রসেসর। তোমাদের শিক্ষক দুটি সংখ্যা লিখে ইনপুট ডিভাইসকে দেবেন। সে মেমোরিতে সেটি জানাবে। প্রসেসর মেমোরি থেকে সেটি জেনে নিয়ে সংখ্যা দুটো যোগ করে আবার মেমোরিকে বলবে। আউটপুট ডিভাইস মেমোরি থেকে সেটি জেনে নিয়ে শিক্ষককে ফেরত দেবে। বিভিন্ন দল একই সাথে শুরু করে দেখো কারা দ্রুত করতে পারে। |
এই পাঠে শিক্ষার্থীরা কম্পিউটার হিসেবে কাজ করবে। প্রথমে একটি কাগজে নিচের সফটওয়্যারটি লিখাবে ঃ

ছেলেমেয়েরা কম্পিউটার কম্পিউটার খেলার জন্য প্রস্তুত
১. প্রথম সংখ্যাটি ইনপুট থেকে মেমোরিতে গ্রহণ কর।
২. মেমোরির সংখ্যাটি প্রসেসরকে দাও-তার সাথে ১০ যোগ করার জন্য।
৩. যোগফলটি প্রসেসর থেকে মেমোরিতে গ্রহণ কর।
৪. মেমোরির থেকে যোগফলটি প্রসেসরকে দাও-২ দিয়ে গুণ করার জন্য।
৫. গুণফলটি প্রসেসর থেকে মেমোরিতে গ্রহণ কর।
৬. গুণফলটি মেমোরি থেকে প্রসেসরকে দাও সেখান থেকে প্রথম সংখ্যাটি বিয়োগ করার জন্য।
৭. বিয়োগফল প্রসেসর থেকে মেমোরিতে গ্রহণ কর।
৮. বিয়োগফলটি মেমোরি থেকে প্রসেসরকে দাও সেখান থেকে প্রথম সংখ্যাটি বিয়োগ করার জন্য।
৯. বিয়োগফলটি প্রসেসর থেকে মেমোরিতে গ্রহণ কর।
১০. মেমোরি থেকে বিয়োগফলটি আউটপুটকে দাও।
একজন ইনপুট, একজন আউটপুট, একজন মেমোরি এবং অন্য একজন প্রসেসর হবে।
শ্রেণির সব শিক্ষার্থীদের চারজন করে অনেকগুলো দলে ভাগ করে দিতে হবে।
প্রথমে শিক্ষক ইনপুটকে সফটওয়্যারটি দেবেন।
ইনপুট সফটওয়্যারটি মেমোরিকে দেবে।
মেমোরিতে সফটওয়্যার লোড হওয়ার পর শিক্ষক যেকোনো একটা সংখ্যা ইনপুটকে দেবেন।
ইনপুট সংখ্যাটি মেমোরিতে দেবে। মেমোরি সংখ্যাটি নিয়ে সফটওয়্যারের ধাপগুলো একটি একটি করে প্রসেসরকে জানাবে। ১০টি ধাপ শেষ করার পর মেমোরি ফলাফলটি আউটপুটকে দেবে। আউটপুট সেটি শিক্ষককে জানাবে।
শিক্ষক ফলাফলটি পরীক্ষা করে দেখবেন সেটি সঠিক হয়েছে কি না। (সঠিক উত্তর ২০)
বিষয়টি কীভাবে হচ্ছে শিক্ষার্থীরা বুঝে যাওয়ার পর তাদেরকে উৎসাহ দেওয়া হবে তারা নিজেরাই যেন এক ধরনের সফটওয়্যার লিখে সেগুলো ব্যবহার করে।
এখানে সফটওয়্যারটি সোজা বাংলায় লেখা হয়েছে। সত্যিকারের কম্পিউটারে সেগুলো কম্পিউটারের ভাষায় লিখতে হয়, সেটাকে বলা হয় প্রোগ্রামিং করা। তোমরা যখন বড় হয়ে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে তখন তোমরা নিজেরাই সুন্দর সুন্দর প্রোগ্রাম লিখতে পারবে।

আমরা ওপরের এই প্রোগ্রামটি পড়ে বুঝতে পারি না, কম্পিউটার কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারে।
আমরা গত দুটি পাঠে দেখেছি কম্পিউটরে তথ্য উপাত্ত প্রবেশ করানোর জন্যে এক ধরনের ইনপুট ডিভাইসের দরকার হয়। আমরা আগেই বলেছি কী-বোর্ড কিংবা মাউস সেরকম ইনপুট ডিভাইস।
কী-বোর্ড দিয়ে বাংলায় বা ইংরেজিতে বা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় লেখা যায় অর্থাৎ কী-বোর্ডের একটি বোতাম চাপলে কম্পিউটারের ভেতর সেই বোতামের জন্যে নির্দিষ্ট অক্ষরটি ঢুকে যায়।
আমরা যে সবসময় অক্ষর বা শব্দ লিখি তা নয়- মাঝেমধ্যে আমাদের অন্য কিছু করতে হয়। যেমন-আমরা যদি একটা ছবি আঁকতে চাই তখন কী-বোর্ড দিয়ে সেটি করা যায় না। একটি মাউস নাড়িয়ে আমরা সেটা করতে পারি।
অনেক সময় পুরো একটা ছবিকে কম্পিউটারে প্রবেশ করানো যায়। যদি ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবিটি তোলা থাকে তাহলে সেটা সরাসরি ক্যামেরা থেকে কম্পিউটারে দিয়ে দেওয়া যায়। যদি ছবিটি প্রিন্ট অবস্থায় থাকে, তাহলে সেটিকে স্ক্যানার দিয়ে স্ক্যান করে কম্পিউটারে প্রবেশ করানো যায়। কাজেই ডিজিটাল ক্যামেরা আর স্ক্যানারও এক ধরনের ইনপুট ডিভাইস।

ডিজিটাল ক্যামেরার মতো ভিডিও ক্যামেরা বা ওয়েব ক্যামও ইনপুট ডিভাইস, সেগুলো দিয়ে ভিডিও কম্পিউটারে প্রবেশ করানো যায়। যারা কম্পিউটারে গেম খেলে তারা অনেক সময় জয়স্টিক (joystick) ব্যবহার করে সেগুলো দিয়ে গেমের তথ্য কম্পিউটারে প্রবেশ করায় সেগুলোও ইনপুট ডিভাইস। তোমরা অনেকেই পরীক্ষার খাতায় বৃত্ত ভরাট করতে দেখেছ। যে যন্ত্রগুলো এই বৃত্ত ভরাট করা খাতা পড়তে পারে, সেগুলোও ইনপুট ডিভাইস-কারণ পরীক্ষার খাতার তথ্যগুলো এই যন্ত্রটি কম্পিউটারে প্রবেশ করিয়ে দেয়। নিচে আরও কতগুলো ইনপুট ডিভাইসের ছবি দেখানো হলো।

| কাজ ১. যে সব ইনপুট ডিভাইসের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো ছাড়া অন্য কী কী ইনপুট ডিভাইস হতে পারে সেটা নিয়ে কল্পনা করে লিখ। ২. ইনপুট ডিভাইস শুধু তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটারে দেওরা যায়। সেখান থেকে কোনো তথ্য ইনপুট ডিভাইসে বের হতে পারবে না। তুমি কি কোনো ইনপুট ডিভাইসের কথা কল্পনা করতে পারবে যেটা একই সাথে আউটপুট ডিভাইস হিসেবেও কাজ করবে? |
তোমরা যদি আগের পাঠগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ে থাক তাহলে এতক্ষণে খুব ভালো করে জেনে গেছ যে, কম্পিউটারের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে মেমোরি, যেখানে তথ্য উপাত্তগুলো জমা করে রাখা হয়। আর সেখান থেকেই প্রসেসর তথ্য উপাত্ত নিয়ে তার ওপর কাজ করে। কাজেই কম্পিউটারে কোনো কাজ করতে হলেই সেটাকে মেমোরিতে নিয়ে রাখতে হয়। মেমোরিটা কম্পিউটারের ভেতরে থাকে বলে আমরা সাধারণত সেগুলো দেখতে পাই না, তাই তোমাদের বইয়ে এই ছবি দেওয়া হলো। মেমোরিতে তথ্য উপাত্তগুলো ক্রমানুসারে সাজানো থাকে যখন খুশি যেকোনো জায়গা থেকে যদি তথ্য উপাত্ত নেওয়া যায় তখন তাকে বলে র্যাম (RAM- Random Access Memory)। বুঝতেই পারছ র্যামে কোনো উপাত্ত রাখা হলে সেটি মোটেই স্থায়ীভাবে থাকে না, যখন খুশি তার ওপর অন্য তথ্য উপাত্ত রাখা যায় তখন আগেরটি মুছে যায়।

মেমোরিতে একটা তথ্য মুছে অন্য তথ্য রাখা যায় শুনে তোমরা নিশ্চয়ই খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছ। তার কারণ অনেক খাটাখাটুনি করে তুমি হয়তো বিশাল একটা সফটওয়্যার তৈরি করেছ, সেটা মেমোরিতে রাখা হয়েছে, সেটা ব্যবহার করে তুমি অনেক কাজকর্মও করেছ। এখন যদি অন্য কেউ তোমার কম্পিউটারে অন্য একটি সফটওয়্যার চালাতে চায় তাহলে তোমার সফটওয়্যার মুছে যাবে! তোমার এতদিনের পরিশ্রম এক নিমিষে উধাও হয়ে যাবে? সেটা তো কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না!
আসলেই সেটা হতে হয় না। র্যামে তথ্য উপাত্ত রাখা হয় সাময়িকভাবে, স্থায়ীভাবে সেটা অন্য কোথাও রাখতে হয়। সেগুলোকে বলে স্টোরেজ ডিভাইস। স্টোরেজ ডিভাইস থেকে ব্যবহারের সময় মেমোরিতে আনা হয়। সবচেয়ে পরিচিত স্টোরেজ ডিভাইসের নাম হচ্ছে হার্ডডিক্স ড্রাইভ। র্যামে যে তথ্যগুলো থাকে সেগুলো অস্থায়ী, কম্পিউটার বন্ধ করলেই সেটা উধাও হয়ে যায়। হার্ডডিস্ক ড্রাইভে যেটা জমা রাখা থাকে সেটা কম্পিউটার বন্ধ করলে উধাও হয়ে যায় না- তবে তুমি ইচ্ছে করলে একটা তথ্য মুছে অন্য একটা তথ্য রাখতে পারবে।
হার্ডডিক্স ড্রাইভগুলো সাধারণত কম্পিউটারে স্থায়ীভাবে লাগানো থাকে। তাই এক কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে তথ্য নেওয়ার জন্য অন্য কোনো একটা পদ্ধতি দরকার।

বিভিন্ন সময়ে তার বিভিন্ন সমাধান এসেছে, এই মুহূর্তে একটা খুবই জনপ্রিয় সমাধানের নাম হচ্ছে পেনড্রাইভ বা ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ (USB Flash Drive)। সেগুলো এত ছোটো যে কলমের মতো পকেটে নিয়ে ঘোরা সম্ভব, এমনকি একটার মধ্যেই দশ থেকে বিশ হাজার বই রেখে দিতে পারবে।

এসএসডি বা সলিড স্টেইট ড্রাইভ (Solid State Drive-SSD)
বর্তমানে হার্ডডিস্কের বিকল্প হিসেবে এসএসডি বা সলিড স্টেইট ড্রাইভ নামে এক ধরনের স্টোরেজ ডিভাইস জনপ্রিয় হয়েছে। এতে ডেটা সংরক্ষণের জন্য ফ্লাশ মেমরি ব্যবহার করা হয়। সার্ভার, ওয়ার্কস্টেশনসহ সকল ধরনের ডিজিটাল কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ডিভাইস, মিডিয়া প্লেয়ার ইত্যাদিতে এসএসডি ব্যবহার করা যায়। বাজারে ৩.৫", ২.৫", ১.৮" এর গুণিতক মাপের এসএসডি পাওয়া যায়। এসএসডি স্টোরেজের ধারণ ক্ষমতা ১২৮ জিবি (GB), ২৫৬ জিবি, ৫১২ জিবি, ১ টিবি (TB) এবং ২ টিবি পর্যন্ত দেখা যায়। কয়েকটি স্ট্যান্ড-এলোন এসএসডি মডেলের ধারণক্ষমতা ৪ থেকে ৮ টিবি পর্যন্ত পাওয়া যায়।
কম্পিউটারের প্রত্যেকটা অংশই খুব গুরুত্বপূর্ণ, তার যেকোনো একটা অংশ না থাকলেই কম্পিউটার আর ব্যবহার করা যাবে না। তারপরও যে অংশটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটা হচ্ছে প্রসেসর। আমরা আগেই বলেছি, কম্পিউটারের প্রসেসর মেমোরি থেকে তথ্য দেওয়া-নেওয়া করে এবং সেগুলো প্রক্রিয়া করে। মেমোরির মতো প্রসেসরও কম্পিউটারের ভেতরে থাকে বলে আমরা সাধারণত সেটা দেখতে পাই না। কিন্তু যদি আমরা একটা কম্পিউটারকে খুলে দেখি তাহলে সেটা আমাদের আলাদাভাবে চোখে পড়বেই!
আমরা যদি একটা কম্পিউটারকে খুলে ফেলি তাহলে সাধারণত একটা বোর্ডকে দেখতে পাব যেখানে অসংখ্য ইলেকট্রনিক্স খুঁটিনাটি লাগানো আছে। এই বোর্ডটার নাম মাদারবোর্ড এবং এটি কম্পিউটারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মা যেভাবে সবাইকে বুকে আগলে রাখে, এই বোর্ডটাও কম্পিউটারের সবকিছু সেভাবে বুকে আগলে রাখে। তাই এর নাম দেওয়া হয়েছে মাদারবোর্ড। একে মেইন সার্কিট বোর্ড, সিস্টেম বোর্ড বা লজিক বোর্ডও বলে। মাদারবোর্ডের ডিভাইসগুলোর মাঝে আমরা দেখতে পাব একটা বেশ বড়ো ডিভাইস। সেটাই প্রসেসর। যার উপর রীতিমতো একটা ফ্যান লাগানো থাকে।

প্রসেসর প্রতি মুহূর্তে লক্ষ কোটি হিসাবনিকাশ করে বলে প্রসেসরের মধ্য দিয়ে অনেক বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় আর সেটা এত গরম হয়ে ওঠে যে একে আলাদাভাবে ফ্যান দিয়ে ঠান্ডা না করলে সেটা জ্বলে পুড়ে যেতে পারে!

মাদারবোর্ডে যেসব ইলেকট্রনিক্স খুঁটিনাটি আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো ও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে প্রসেসর। বিশ্বের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান প্রসেসর তৈরি করে। যেমন-ইনটেল, এএমডি, এনভিডিয়া, মটোরোলা, এআরএম, আলতেরা ইত্যাদি।

| কাজ প্রসেসর অনেক গরম হয় বলে সেটাকে ফ্যান দিয়ে ঠান্ডা করতে হয়। সুপার কম্পিউটারে হাজার হাজার প্রসেসর থাকে, সেটাকে শুধু ফ্যান দিয়ে ঠান্ডা করা যায় না-সেটাকে কীভাবে ঠান্ডা করা যায় সেটা নিয়ে তোমার নিজের একটা সমাধান দাও |
তোমরা এর মাঝে জেনে গেছ যে, ইনপুট ডিভাইস দিয়ে কম্পিউটারের ভেতর তথ্য উপাত্ত পাঠানো হয়। কম্পিউটার মেমোরি আর প্রসেসর দিয়ে সেই তথ্য উপাত্তের ওপর কাজ করে, যে ফলাফল পাওয়া যায় সেটা আউটপুট ডিভাইস দিয়ে বাইরের জগতে পাঠিয়ে দেয়। আগের পাঠগুলো থেকে তোমরা জেনে গেছ যে, মনিটর আর প্রিন্টার এক ধরনের আউটপুট ডিভাইস।
তোমরা যারাই কম্পিউটার দেখেছ বা ব্যবহার করেছ কিংবা কম্পিউটারের ছবি দেখেছ তারা সবাই কম্পিউটারের মনিটরটিকে আলাদাভাবে চিনতে পার, কারণ সেটা দেখতে অনেকটা টেলিভিশনের মতো। কম্পিউটারের ভেতর যা কিছু ঘটে সেটাকে মনিটরে দেখানো যায়। তাই যারা কম্পিউটার ব্যবহার করে তারা কম্পিউটারের মনিটরের ওপর চোখ রেখে কম্পিউটার ব্যবহার করে। তুমি যদি কম্পিউটারে কিছু লিখ তাহলে মনিটরে সেটা দেখতে পাবে-যদি কোনো ছবি আঁক, সেটাও তুমি দেখতে পাবে!
কোনো কিছু যখন কম্পিউটারের মনিটরে দেখা যায়, সেটা মোটেও স্থায়ী কিছু নয়-নতুন কিছু এলেই আগেরটা আর থাকে না। তাই যদি স্থায়ীভাবে কিছু সংরক্ষণ করতে হয়, তাহলে অন্য কিছুর দরকার হয়। আর তার জন্যে সবচেয়ে সহজ সমাধান হচ্ছে প্রিন্টার। এই বইয়ের জন্যে যা কিছু লেখা হয়েছে, সবকিছু প্রথমে একটা প্রিন্টার ব্যবহার করে ছাপিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বই বা চিঠিপত্র ছাপানোর জন্য সাধারণ মাপের কাগজে প্রিন্ট করানো যায়। কিন্তু যদি কোনো বড়ো বড়ো বিজ্ঞাপন, পোস্টার, ব্যানার, বাড়ির নকশা ছাপাতে হয়, তাহলে আর সাধারণ প্রিন্টার ব্যবহার করা যায় না-তখন প্লটার ব্যবহার করতে হয়।
আমরা যে আউটপুট ডিভাইস ব্যবহার করে সব সময়েই কিছু একটা প্রিন্ট করে স্থায়ীভাবে রাখতে চাই তা নয়, অনেক সময় আমরা শব্দকেও আউটপুট হিসেবে পেতে চাই। যেমন আমরা হয়ত গান শুনতে চাই। কাজেই শব্দকে আউটপুট হিসেবে পাওয়ার জন্যে কম্পিউটারের সাথে স্পিকার লাগাতে পারি, তাই স্পিকারও হচ্ছে এক ধরনের আউটপুট ডিভাইস।

মনিটরে আমরা দেখতে পাই, স্পিকারে শুনতে পাই। তাই কম্পিউটার আসলে বিনোদনের একটা বড়ো মাধ্যম হয়ে গেছে। কম্পিউটারের ছোটো মনিটরে এক সাথে একজন দেখতে পায়-অনেক সময়ই সেটা যথেষ্ট নয়। অনেক সময়ই এক সাথে অনেকের দেখার দরকার হয়। যখন কেউ বর্তা, আলোচনা বা সেমিনারে কোনো কিছু উপস্থাপন করে, কিংবা যদি আমরা ওয়ার্ল্ড কাপ খেলা বা সিনেমা দেখতে চাই তখন মনিটরের দৃশ্যটি অনেক বড়ো করে দেখাতে হয়। এরকম কাজের জন্য মাল্টিমিডিয়া বা ভিডিও প্রজেক্টর ব্যবহার করা হয়।
প্রজেক্টর মনিটরের দৃশ্যটি অনেক বড়ো করে বিশাল স্ক্রিনে দেখাতে পারে। একসময় কম্পিউটার মনিটর সবচেয়ে বেশি জায়গা দখল করত, তবে আজকাল মনিটরগুলো হয়ে গেছে পাতলা।
ইনপুট ডিভাইস নিয়ে আলোচনা করার সময় তোমাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল এমন কিছু কি হতে পারে যেটা একই সাথে ইনপুট এবং আউটপুট ডিভাইস দুটোই হতে পারে? অবশ্যই হতে পারে এবং এরকম যন্ত্র বা ডিভাইসের নাম হচ্ছে টাচস্ক্রিন! টাচস্ক্রিনের একটা স্ক্রিন আছে যেটা মনিটরের মতো কাজ করে এবং সেই স্ক্রিনে টাচ বা স্পর্শ করে তার ভেতর তথ্য পাঠানো যায়। আজকাল শুধু কম্পিউটারের জন্যে নয় মোবাইল টেলিফোনের পর্যন্ত টাচস্ক্রিন রয়েছে।

কিছু ডিভাইস ইনপুট ও আউটপুট উভয় হিসাবে ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন-টাচস্ক্রিন, পেনড্রাইভ, এসএসডি, হার্ডডিস্ক ইত্যাদি।
| কাজ তোমরা কি নতুন কোনো একটা আউটপুট ডিভাইসের কথা কল্পনা করতে পার? যা দিয়ে দেখা বা শোনা ছাড়াও আমরা অন্য কিছু করতে পারি? |
ইনপুট, আউটপুট, মেমোরি এবং প্রসেসর এর সবই হচ্ছে যন্ত্রপাতি বা হার্ডওয়্যার। কম্পিউটারে এই যন্ত্রপাতিগুলো সফটওয়্যারের সাহায্যে সচল এবং অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই পাঠে আমরা সেগুলো একটু আলোচনা করব।
খুব সাধারণভাবে কম্পিউটারের সফটওয়্যারকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। এক ভাগের কথা আমরা আগেই আলোচনা করেছি। আমরা বলেছি, আমরা কম্পিউটার দিয়ে লিখতে পারি, ছবি আঁকতে পারি, গান শুনতে পারি, ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়াতে পারি এবং এরকম আরও অসংখ্য কাজ বা অ্যাপ্লিকেশন করতে পারি, তাই এই ধরনের সফটওয়্যারকে বলে অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার।
কিন্তু এই অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারকে সোজাসুজি একটা কম্পিউটারে ব্যবহার করা যায় না। কম্পিউটারে যদি সেগুলো ব্যবহার করতে হয়, তাহলে কম্পিউটারকে আগে অন্য একটা সফটওয়্যার দিয়ে সচল করে রাখতে হয়। সেই সফটওয়্যারের নাম হচ্ছে অপারেটিং সিস্টেম সফটওয়্যার বা সংক্ষেপে অপারেটিং সিস্টেম বা আরও সংক্ষেপে ওএস (OS)। একটা কম্পিউটারকে যখন প্রথম সুইচ টিপে অন করা হয়, সাথে সাথে অপারেটিং সিস্টেম তার কাজ শুরু করে দেয়। সে কম্পিউটারের সব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে দেখে, সব যন্ত্রপাতিকে একটির সাথে আরেকটির যোগাযোগ করিয়ে দেয়, ইনপুট আউটপুটকে সচল করে। কম্পিউটারে যদি কিছু তথ্য জমা রাখতে হয় সেগুলো জমা রাখার ব্যবস্থা করে ইত্যাদি।

কাজেই অপারেটিং সিস্টেম একটা কম্পিউটারকে সচল করে রাখে, ব্যবহারের উপযোগী করে রাখে অপারেটিং সিস্টেম কম্পিউটারের অনেক কাজকে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখে; যেন অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার সেগুলোকে ব্যবহার করতে পারে।
বড় বড় সুপার কম্পিউটারের নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম রয়েছে। আমাদের পরিচিত যে পিসি বা পারসোনাল কম্পিউটার রয়েছে, সেগুলোর অপারেটিং সিস্টেমগুলোর নাম হচ্ছে উইন্ডোজ, ম্যাক, ইউনিক্স ইত্যাদি। কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার যেরকম টাকা দিয়ে কিনতে হয়, অপারেটিং সিস্টেমও কিন্তু সেভাবে টাকা দিয়ে কিনতে হয় এবং এগুলো যথেষ্ট মূল্যবান। পৃথিবীর অনেক কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা মিলে তাই এক ধরনের মুক্ত অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করেছেন, যেগুলো বিনামূল্যে পাওয়া যায়। বিনামূল্যে পাওয়া যায় বলে তোমরা কিন্তু মনে কোরো না সেগুলো কার্যকর নয়। সেগুলো অত্যন্ত চমৎকার অপারেটিং সিস্টেম। এরকম একটি মুক্ত অপারেটিং সিস্টেমের নাম হচ্ছে লিনাক্স, যেটা পৃথিবীজুড়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় অপারেটিং সিস্টেম!


উইন্ডোজ, ম্যাক এবং মুক্ত সফটওয়্যার লিনাক্সের স্ক্রিন ব্যবহার করার মধ্যে কোনো বড়ো ধরনের পার্থক্য নেই। স্মাট ফোন, ট্যাবলেট এবং প্যাডের জন্য বিভিন্ন ধরনের অপারেটিং সিস্টেম যেমন এ্যান্ড্রয়েড, আইওএস, উইন্ডোজ, ক্রমওএস এবং কাইওএস ব্যবহার করা হয়।
| কাজ অনেক টাকা দিয়ে উইন্ডোজ সফটওয়্যার কেনা ভালো, নাকি না কিনে বেআইনিভাবে উইন্ডোজ সফটওয়্যার জোগার করে সেটা ব্যবহার করা ভালো, নাকি বিনামূল্যের লিনাক্স সফটওয়্যার ব্যবহার করা ভালো, সেটা নিয়ে নিজেদের মধ্যে তিনটি দলে ভাগ হয়ে বিতর্ক কর। |
তোমরা যারা আগের পাঠগুলো পড়ে এসেছ, তারা সবাই এরই মধ্যে অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার বলতে কী বোঝানো হয় সেটা জেনে গেছ। আমরা আগেই বলেছি, কম্পিউটার দিয়ে কী কী কাজ করা সম্ভব সেটা নির্ভর করে আমাদের সৃজনশীলতার ওপর। আমরা যেকোনো একটা কাজ খুঁজে বের করে সেটা করার জন্যে একটা অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার তৈরি করে ফেলতে পারি।
অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার দু'ধরনের: ১। প্যাকেজ সফটওয়্যার ২। কাস্টমাইজড সফটওয়্যার
যে কাজগুলো প্রায় সবারই করতে হয়, সেগুলোর জন্যে আলাদাভাবে অনেকেই অ্যাপ্লিকেশান সফটওয়্যার তৈরি করে ফেলে। যেমন, লেখালেখির অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার-এটাকে বলে ওয়ার্ড প্রসেসর। এটি সবাই ব্যবহার করতে চায় বলে অনেক চমৎকার ওয়ার্ড প্রসেসর তৈরি হয়েছে। ঠিক সেরকম ছবি আঁকার জন্যে, গান শোনার জন্যে, ভিডিও দেখার জন্যে, নানা ধরনের কম্পিউটার গেম খেলার জন্যে, ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে আলাদাভাবে সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। এই ধরনের সফটওয়্যারের নাম হচ্ছে প্যাকেজ সফটওয়্যার। বিভিন্ন কোম্পানি যেরকম গাড়ি, টেলিভিশন, ক্যামেরা তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে টাকা উপার্জন করে, ঠিক সেরকম পৃথিবীর অনেক কোম্পানি প্যাকেজ সফটওয়্যার তৈরি করে মানুষের কাছে বিক্রয় করে টাকা উপার্জন করে। তোমরা শুনে হয়ত অবাক হবে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষদের অনেকেই প্যাকেজ সফটওয়্যার বিক্রি করে ধনী হয়েছে।
আমরা একটু আগে বলেছি, সব ধরনের কাজের জন্যেই কোনো না কোনো অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার আছে। তাহলে কি সফটওয়্যার তৈরি করার সফটওয়্যার আছে? অবশ্যই আছে, আমরা তোমাদের আগেই বলেছি তোমরা যখন আরেকটু বড়ো হয়ে প্রোগ্রামিং করা শিখবে, তখন তোমরা ইচ্ছে করলে সফটওয়্যার তৈরি করার সফটওয়্যার ব্যবহার করে নানা ধরনের বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করতে পারবে! একটা বিশেষ কাজের জন্যে যখন আলাদাভাবে একটা বিশেষ সফটওয়্যার তৈরি করা হয়, তখন তাকে বলে কাস্টমাইজড সফটওয়্যার।
অপারেটিং সিস্টেম যেন পৃথিবীর মানুষ বিনামূল্যে পেতে পারে সেজন্যে যেরকম পৃথিবীর বড়ো বড়ো কম্পিউটার বিজ্ঞানীরা অপারেটিং সিস্টেম তৈরি করেছেন ঠিক সেরকম নানা ধরনের প্যাকেজ সফটওয়্যারও সেভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রায় বিনামূল্যে তোমরা এই সফটওয়্যারগুলো পেতে পার এবং ব্যবহার করতে পার।
সারা পৃথিবীজুড়ে বিজ্ঞানীরা প্রায় বিনামূল্যে সবার কাছে সব ধরনের সফটওয়্যার পৌঁছে দেওয়ার জন্যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বড়ো হয়ে তোমরাও হয়ত এই ধরনের আন্দোলনে যোগ দেবে!
বিভিন্ন ধরনের অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যার ব্যবহার করার সময় মনিটরের দৃশ্য:


ছবি আঁকার সফটওয়্যার

গেম খেলার সফটওয়্যার
কাজ
|
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয় সেরকম যন্ত্রপাতির কথা আলোচনা করতে গিয়ে আমরা এই প্রযুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের কথা আলোচনা করেছি। এখন আমরা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয় এরকম আরও কিছু যন্ত্রপাতির কথা আলোচনা করব।
ল্যান্ডফোন এবং মোবাইল ফোন: একসময় ফোনে কথাবার্তা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পাঠানোর
জন্য বৈদ্যুতিক তার ব্যবহার করা হতো এবং তারের ভেতর দিয়ে আমাদের কথাবার্তাগুলো বৈদ্যুতিক সংকেত হিসেবে আসা-যাওয়া করত। যেহেতু বৈদ্যুতিক তার দিয়ে সংকেত পাঠাতে হতো তাই টেলিফোনে সব সময়ই তারের সংযোগ রাখতে হতো এবং আমরা সেগুলোকে বলি ল্যান্ডফোন।
প্রযুক্তির উন্নতি হওয়ার কারণে আমরা ইচ্ছা করলে তার দিয়ে না পাঠিয়ে বেতার বা ওয়্যারলেস সংকেত পাঠাতে পারি। যেহেতু তারের সাথে এই ফোনের সংযোগ রাখার প্রয়োজন নেই, তাই আমরা ইচ্ছে করলেই এই ফোনগুলোকে পকেটে নিয়ে ঘুরতে পারি। সেজন্য এই ফোনকে আমরা বলি মোবাইল (ভ্রাম্যমাণ!) ফোন। এই ফোনের দাম অনেক কমে এসেছে তাই দেশের সাধারণ মানুষেরাও এখন এটা ব্যবহার করতে পারে।
শুধু যে মোবাইল ফোনের দাম কমেছে তা নয়, মোবাইল ফোন এখন ধীরে ধীরে স্মার্টফোন হয়ে দাঁড়িয়েছে! এই ফোন দিয়ে আমরা ছবি তুলতে পারি, গান শুনতে পারি, রেডিও শুনতে পারি, জিপিএস দিয়ে পথেঘাটে চলাফেরা করতে পারি, গেম খেলতে পারি এমনকি ইন্টারনেট পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারি! কাজেই আমরা অনুমান করতে পারি, ভবিষ্যতে এই মোবাইল টেলিফোন অনেক সময়ই কম্পিউটারের কাজগুলো করতে পারবে!

মডেম: মডেম হলো এমন একটি যন্ত্র যা তোমার কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং অন্যান্য ডিভাইসগুলিকে ইন্টারনেটের সাথে সংযুক্ত করে। এটি ডিভাইসগুলি থেকে ডিজিটাল সিগন্যালগুলিকে এনালগ সিগন্যালে রূপান্তরিত করে, যা টেলিফোন লাইন বা কেবলের মাধ্যমে প্রেরণ করা যায় ।
স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ: আমরা যদি পৃথিবীর এক পৃষ্ঠ থেকে অন্য পৃষ্ঠে তথ্য পাঠাতে চাই তাহলে অনেক সময় উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হয়। পৃথিবী থেকে মহাকাশের দিকে মুখ করে থাকা এন্টেনা দিয়ে তথ্যগুলো উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটে পাঠানো হয়। স্যাটেলাইট সিগন্যালটি গ্রহণ করে আবার অন্যদিকে পাঠিয়ে দেয়। টেলিভিশনের অসংখ্য চ্যানেল এভাবে সারা পৃথিবীতে বিতরণ করা হয়। ১২ মে ২০১৮ বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে প্রেরণ করা হয়। নিজস্ব স্যাটেলাইটের অধিকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পৃথিবীর ৫৭তম দেশ।

অপটিক্যাল ফাইবার: একসময় পৃথিবীর সব তথ্যই পাঠানো হতো তারের ভেতর বৈদ্যুতিক সংকেত অথবা তারবিহীন ওয়্যারলেস সংকেত হিসেবে। এখন সারা পৃথিবীতেই তথ্য উপাত্ত পাঠানোর জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তি গড়ে উঠেছে সেটি হচ্ছে অপটিক্যাল ফাইবার প্রযুক্তি। অপটিক্যাল ফাইবার আসলে কাচের অত্যন্ত স্বচ্ছ তন্তু, সেটি চুলের মতো সরু এবং এর ভেতর দিয়ে আলোর সংকেত হিসেবে তথ্য এবং উপাত্ত পাঠানো যায়। আলোর সংকেতের জন্য লেজারের আলো ব্যবহার করা হয়। তোমরা শুনে অবাক হবে এই আলো কিন্তু চোখে দেখা যায় না। একটি অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে এক কোটি টেলিফোন লাইনের সমান তথ্য পাঠানো যায়; কাজেই সেটি সারা পৃথিবীতেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।

| কাজ অপটিক্যাল ফাইবার, মডেম, কম্পিউটার ব্যবহার করে কীভাবে একটা কম্পিউটার থেকে অন্য কম্পিউটারে তথ্য পাঠানো যায় তার একটি ছবি আঁক। |
১. বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তারবিহীন যোগাযোগ মাধ্যম কোনটি?
ক. রেডিও
খ. টেলিভিশন
গ. মোবাইল
ঘ. ল্যান্ডফোন
২. প্রসেসরকে কম্পিউটারের মস্তিষ্ক বলার কারণ হচ্ছে প্রসেসর-
i. মাদারবোর্ডের সাথে সংযুক্ত থাকে
ii. কম্পিউটারের নির্দেশক হিসেবে কাজ করে
iii. তথ্যের প্রক্রিয়াকরণের কাজ করে
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i
খ. ii
গ. iii
ঘ. i, ii ও iii
৩. তোমার লেখা কবিতাগুলো কম্পিউটারে দীর্ঘ সময়ের জন্য সেভ বা সংরক্ষণ করতে চাও। এক্ষেত্রে কোন ডিভাইসটি ব্যবহার করবে?
ক. র্যাম
খ. হার্ডডিস্ক ড্রাইভ
গ. প্রসেসর
ঘ. পেনড্রাইভ
৪. একই সাথে ইনপুট এবং আউটপুট ডিভাইস হিসেবে কোনটি কাজ করে?
ক. মনিটর
খ. টাচ স্ক্রিন
গ. কি-বোর্ড
ঘ. মাদার বোর্ড
৫. অপারেটিং সিস্টেমের প্রধান কাজ হচ্ছে-
ক. ইনপুট-আউটপুট অপারেশন
খ. ফাইল সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ
গ. প্রোগ্রাম পরিচালনার পরিবেশ সৃষ্টি
ঘ. বিভিন্ন ডিভাইসের ত্রুটি নির্ণয়
নিচের অনুচ্ছেদটি পড়ে ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নের উত্তর দাও।
হাসান সাহেব তাঁর নাতি-নাতনিদের সাথে বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার নিয়ে গল্প করছিলেন। তিনি বলেন, এখন একই যন্ত্রের সাহায্যে মজার মজার অনুষ্ঠান দেখা যায়, শোনা যায়, এমনকি রেকর্ড করে পরেও তা উপভোগ করা যায়। কোনো খবর যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় পৌঁছানো কত সহজ হয়ে গেছে। অথচ এমন একদিন ছিল যখন এগুলোর কিছুই ছিল না। জরুরি অনেক খবর পেতে কয়েক মাস লেগে যেত।
৬. হাসান সাহেবের গল্পে বিজ্ঞানের যে উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা হলো-
i. স্যাটেলাইট টেলিভিশনের উন্নয়ন
ii. ডাক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
iii. তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিকাশ
নিচের কোনটি সঠিক?
ক. i
খ. ii
গ. i ও iii
ঘ. ii ও iii
৭. হাসান সাহেব যেকোনো খবর যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে দ্রুত পাঠাতে কোন মাধ্যম ব্যবহার করবেন?
ক. ইন্টারনেট
খ. ল্যান্ডফোন
গ. রেডিও
ঘ. মোবাইল ফোন
৮. পৃথিবীর এক পৃষ্ঠ থেকে অপর পৃষ্ঠে তথ্য পাঠানোর কাজে ব্যবহৃত প্রযুক্তি কোনটি?
ক. অপটিক্যাল ফাইবার
খ. ইন্টারনেট
গ. মোবাইল ফোন
ঘ. স্যাটেলাইট
Read more